ভাইরাস সংস্কৃতি

149

সোহিনী মুখোপাধ্যায় | ০৫ আগস্ট ২০২০

ক্যাপিটালিজমের ভাইরাসকে পরিচালক বং জুন হো তাঁর ছবি প্যারাসাইটে, খানিকটা দর্শকের স্বার্থেই, সহজলভ্য ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। সিনেম্যাটিক অ্যাঙ্গেলে সযত্নে গড়েছেন, বহু যুগ ধরে চলে আসা এই অধ্যায়ের রূপ।

ছবিটি তৈরি, সাউথ কোরিয়ায় সবথেকে নিচু অংশে। যার নাগাল পাওয়া যায় অগুনতি সিঁড়ি পেরিয়ে। সেখানে ছোট্ট অগোছালো আলো অন্ধকার মেশানো ঘিঞ্জি ঘরে থাকে কিম পরিবার। ওরা একসাথে ওয়াইফাই চুরি করার ফন্দি আঁটে, পাড়ার লোকেদের সাথে নানা কারণে ঝগড়া করে। তবে দিনের শেষে চারমূর্তি মিলে পিৎজার বাক্স ভাঁজ করতে করতে স্বপ্ন দেখে একটা স্বচ্ছল জীবনের। তাদের ভাবনার জাল ভেদ করে মাথা চাড়া দেয় এক বিশাল প্রাসাদ। যেখানে অর্ধেক কাঁচের জানলা দিয়ে মাথা উঁচু করে আকাশ দেখতে হবে না। খোলা আকাশের নিচে প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিতে পারবে তারা। ছেলের বিদেশে পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে। রোজনামচায় হঠাৎ বাধ সাধে এক সৌভাগ্য-পাথর। কিছুটা কাকতালীয়ভাবেই যেন সেই পাথরের দৌলতেই বদলাতে থাকে কিম পরিবারের জীবন। একের পর এক ঘটনাক্রমে আমূল পরিবর্তন আসে তাদের জীবনে।

সম্ভ্রান্ত পার্ক পরিবারের মেয়ে ডাহ্যয়ের (Dahye) ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয় কিম পরিবারের ছেলে, কেভিনকে। ক্যামেরার লেন্স যখন উঁচু সিঁড়ি বেয়ে, পড়ন্ত বেলার মিঠে রোদের সোনালী ছাড়া বেয়ে পৌঁছয় সেই সমৃদ্ধশালী বাড়িতে। সেই ছবি যেন কিমদের সাথে সাথে আমাদেরও মনের কোণে সযত্নে আঁকা সেই বাড়ির আকৃতির সাথে হুবহু মিলে যায়। ধীরে ধীরে এগোয় গল্প। শুরু হয় ছবির আসল থ্রিল। চোখের পলকে অজস্র মন্তাজ ও অপেরার সুরের চড়াই-উতরাইয়ের কৌশলে পার্ক পরিবারের চোখে ধুলো দিতে শুরু করে কিমরা। বাড়ির অন্যান্য কাজের লোকদের বের করে, সবার অলক্ষ্যেই সেখানে জাঁকিয়ে বসে কিম পরিবার।

চারমূর্তির এই খেলায় হঠাৎ একদিন বাধ সাধে। একরাতে, পার্কদের অনুপস্থিতিতে ফিরে আসে তাদের পুরোনো কাজের লোক মুন-গোয়াং (Moon-gwang)। তার দাবি, সে এই বাড়িতে বহুমূল্য জিনিস ফেলে গেছে। রহস্য বাড়ে। সাথে রোমাঞ্চও। আরও একবার সেই মহিলার পিছু ধরে, অগুনতি সিঁড়ি পেরিয়ে বাড়ির নিচে খোঁজ মেলে এক গুপ্ত কুঠুরির। যেখানে বদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়, এই বাড়ির নির্মাতা মুন-গোয়াংয়ের স্বামী, গুয়েন-স্যয়’কে (Geun-sae)। বোঝা যায়, বহুবছর ধরেই চলছে এই স্বামী স্ত্রীর অভিনয়।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে জট খোলে বহু রহস্যের। একবারের জন্যও চোখ ফেরানো যায় না পর্দা থেকে। টানটান উত্তেজনার পারদ সেঁধিয়ে যায় যেন দর্শক মনে। তবে গল্পটা এইটুকুই থাক। বাকিটুকু আশ না হয় নিজেরাই দেখে মেটাবেন। প্যারাসাইট আসলে এই পুঁজিবাদী এবং আত্মকেন্দ্রিক সমাজের মুখে সপাটে চড়, ডার্ক কমেডি থ্রিলার। এসি ঘরে বসে “এই লোকগুলো যে কেন ডিম্ভাতের লোভে ওখানে যায়” বলা মানুষ এবং যারা সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পেটের জ্বালাকে নিজেদের লাভের অঙ্কে পরিণত করে, এমন লোকেদের বিবেকে এক তীব্র জ্বালার অনুভূতি এই প্যারাসাইট।

বাড়ির সমস্ত কাজ একহাতে সামলানো মানুষদের গায়ের গন্ধ নিয়ে নাক সিঁটকায় না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। পরিচালক ও গল্পকার তাঁর এই ছবিতে নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সেই নিদর্শন। পার্ক পরিবারের সাথে থাকলেও যে কিমরা আদৌ সেই বাড়ির সদস্য নন, তা প্রতি মুহূর্তে পর্দায় একটি সূক্ষ্ম রেখার তফাতে বোঝান পরিচালক।

ছবিতে, কিম পরিবারের পার্কদের বাড়িতে একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া এবং শেষবারের মতো চারজনের একসাথে জীবনের স্বাদ উপভোগ করার দৃশ্যটিকে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির “দ্য লাস্ট সাপার”এর সাথেও তুলনা করা হয়েছে। গোটা ছবিতে সিঁড়িকে এক অনন্য রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন পরিচালক। এই সিঁড়িই আসলে ছবির মূল বিষয়, অর্থাৎ ক্যাপিটালিজমের প্রধান অস্ত্র। একরাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি, ড্রেনের নোংরা জল উপচে ঘর ভেসে যাওয়ায় কিম পরিবারের ঠাঁই হয় ত্রাণ শিবিরে। অপরদিকে সেই বৃষ্টিতে পরেরদিনের পরিষ্কার সকালে ছেলের জন্মদিনের পার্টির উচ্ছ্বাসে ভাসে পার্ক পরিবার।

“পার্ক কর্ত্রী বড়োলোক হলেও, ভালো মানুষ”এর প্রতিউত্তরে, খিটখিটে কিম-কর্ত্রীর “সে বড়োলোক, তাই ভালো মানুষ” জবাব যেন আমাদের মুহূর্তে এনে ফেলে বৈসাদৃশ্যের বাস্তবতায়! গোটা ছবিতে নানা ঘটনাক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবহৃত অসাধারণ মন্তাজ, ক্যামেরার গতিবিধি এবং অপেরার সুরের ব্যবহার এতটাই মসৃণ, যে তা চোখ ও মন উভয়েই আরাম দেবে। পরিচালকের হাতের ক্যারিশমা ও ইশারার ফাঁদে পা দিতে বাধ্য হবে দর্শককুল।

হাসি, কান্না, ভালো লাগা, খারাপ লাগা, টানটান উত্তেজনা, জীবনের ওঠাপড়া, আশা, ভরসা, কোথাও আবার সবটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার মাঝেই শেষ হয় এই ছবি। সবকিছুর শেষেও যেন অসংখ্য প্রশ্নের ঝুলি ফেলে যায় আমাদের উদ্দেশ্যে। যার উত্তর তো সবারই জানা, কিন্তু আদৌ কিন্তু, পালাবার যে পথ আর নাই!

পরীক্ষামূলক প্রকাশনা
তথ্যসূত্র

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে