আমাদের কালের নায়ক

 

পটুয়াখালীর কলাপাড়া ৫০ শয্যা হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. হাফিজুর রহমান গোটা উপজেলার মানুষের কাছে করোনাযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁর সাহসী কর্মকান্ডে গর্বিত উপজেলায় কর্মরত চিকিৎসক ও মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মীরাও। করোনার ভয়াবহতায় জীবন বাঁচাতে পরিবার,স্বজন নিয়ে যখন গোটা কলাপাড়ার মানুষ গৃহবন্দী, তখন হাফিজুর রহমান কাদা, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে একাকী ছুটেছেন করোনায় আক্রান্ত ও মৃত মানুষের বাড়ি বাড়ি। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ভয়ে পরিবারের স্বজনরা এগিয়ে না আসায় কখনও কখনও নমুনা সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিজ হাতে খাইয়েছেন। তাঁর এ কাজের জন্য এখনও কোন সরকারি স্বীকৃতি কিংবা আর্থিক প্রণোদনা না পেলেও ভবিষতেও যেকোনো মহামারীতে মানুষের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। মানুষের ভালবাসা ও দোয়া নিয়ে সেবা করতে চান দূর্গত ও অসহায় বিপদাপন্ন মানুষের।

সরকারি হিসেবে গত আট মাসে কলাপাড়ায় ১১৭২ জনের করোনার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এরমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ১৬২ জন, আর মারা গেছে ছয় জন। হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. হাফিজুর রহমান একাই নমুনা সংগহ করেছেন আট শতাধিক মানুষের। করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে পর্যাপ্ত পিপিই সহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী না পেলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাফিজুর রহমান একাই ছুটেছেন প্রত্যন্ত এলাকায়। পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরত বিদেশী শ্রমিক থেকে শুরু করে কুয়াকাটায় ভ্রমনে আসা পর্যটকদের নিজ হাতে নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে আক্রান্ত ব্যক্তির ফরমও পূরণ করতে হয়েছে তাকে। লোকবলের অভাবে সঠিক সময়ে সংগৃহীত নমুনা নির্দিষ্ট গাড়িতে তুলে দেয়ার কাজ পর্যন্ত করতে হয়েছে তাঁকে। স্ত্রী দুই ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের পিতা হাফিজুর রহমান করোনা রোগীদের নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ ও তাদের রিপোর্ট দিতে হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে। কখনও কখনও গভীর রাত পর্যন্ত একাকী হাসপাতালের পরীক্ষাগারে থাকতে হয়েছে তাকে। করোনা বন্ধু হলেও স্বজন ও সমাজ থেকে তাকে হতে হয়েছে বঞ্চিত। তাঁকে দেখে মানুষ দূরে সরে যেতো করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহের কারণে। ভিন্ন চোখে দেখতো। এ নিয়েও তার নেই কোনো আক্ষেপ।

করোনাযোদ্ধা হাফিজুর রহমানের কাজের প্রশংসা করে কলাপাড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. হুমায়ুন কবির বলেন, মহামারির সময়ে সে যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহস জুগিয়েছেন, নমুনা সংগ্রহ করেছেন, তা কলাপাড়াবাসী মনে রাখবে। আর ক্রীড়া সংগঠক গৌতম হালদার বলেন, হাফিজুর রহমানের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা উচিত।

কলাপাড়া হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ চিন্ময় হাওলাদার বলেন, এপ্রিল থেকে কলাপাড়ায় প্রথম করোনাভাইরাস রোগী সনাক্তের পর হাফিজুর রহমান নিরলসভাবে কাজ করে গেছে। তাঁর কাজের আন্তরিকতায় মানুষ সাহস পেয়েছে, নমুনা সংগ্রহে গতি ফিরেছে এবং কলাপাড়ায় করোনার প্রকোপ থেকে প্রাণহানি অনেকটা কমেছে মানুষ সচেতন হওয়ায়। ভবিষ্যতেও তাঁর ও স্বাস্থ্য বিভাগের এ কর্মকান্ড অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।

কলাপাড়ার সচেতন মহলের দাবি করোনার মহামারিতে যখন মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত, তখন একাকী আক্রান্ত ব্যাক্তির নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে তার স্বাস্থ্যের নিয়মিত খোঁজ খবর নিয়েছেন হাফিজুর রহমান। পরিবারকে সময় না দিয়ে একাই সামলেছেন হাসপাতালের সাধারণ রোগী ও করোনা আক্রান্ত রোগীদের। একজন হাফিজুর রহমান পুরস্কৃত হলে ভবিষতে যেকোনো মহামারীতে স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের পাশে থেকে সেবা করার উৎসাহ পাবেন বলে সচেতন মহল মনে করছেন।

আপনার মতামত জানান

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন