স্বেচ্ছাশ্রমে ভাসমান সেতু

নিজস্ব সংবাদদাতা, পটুয়াখালী, ১০ জানুয়ারি ২০২০

গ্রামের গৃহবধুরা দিয়েছেন মুষ্টির চাল বিক্রির টাকা। কৃষকরা দিয়েছেন ক্ষেতের সবজি বিক্রির টাকা। আর স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা দিয়েছেন টিফিনের জমানো টাকা। এভাবে গ্রামবাসীদের চাঁদায় টাকায় নির্মাণ হচ্ছে প্রায় ১১৬ মিটার দীর্ঘ ভাসমান সেতু। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার পাখিমারা খালের উপর এ সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে গত এক সপ্তাহ ধরে। গ্রামবাসীরা সেচ্ছাশ্রমে নির্মাণ করছে এ সেতুটি। দুই মাস আগে পাখিমারা ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন আয়রণ সেতুটি ভেঙ্গে পড়ার পর সেতুটি নির্মাণে সরকার ও জন প্রতিনিধিরা ব্যবস্থা না নেয়ায় আট গ্রামের কৃষকসহ সর্বস্তরের মানুষ এ ভাসমান সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ইতিমধ্যে সেতুটির দুই তৃতীয়াংশ নির্মান কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কলাপাড়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন, ভেঙ্গে পড়া সেতুটির স্থানে গার্ডার সেতু নির্মানের প্রস্তাবনা মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই নির্মান কাজ শুরু হবে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া সংবাদদাতা মিলন কর্মকার রাজুর তথ্য ও ছবিতে প্রতিবেদন।

কলাপাড়ার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের আট গ্রামের কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষে কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ থেকে পাখিমারা খালের উপর ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে আয়রণ সেতু নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সেতু নির্মানের ছয় বছরের মধ্যেই এ বছরের ৫ আগষ্ট সেতুটি ভেঙ্গে খালে পড়ে যায়। এতে গত দুই মাস ধরে বন্ধ হয়ে যায় উপজেলা সদরের সাথে আট গ্রামের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

কলাপাড়া উপজেলার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ভাঙ্গা সেতুর স্থান পরিদর্শণ করলেও সেতুটি পুনঃ নির্মাণের কোন উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি ভাঙ্গা সেতুর স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে খালের উপর একটি বাশের সাঁকো নির্মানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় গ্রামবাসীদের। কিন্তু গত দুই মাসেও সেতুটি নির্মান কাজে কোন অগ্রগতি হয়নি। এ কারনে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার গ্রামবাসী ছোট ডিঙ্গি নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতো। প্রতিদিনই ঘটতো দূর্ঘটনা।

নীলগঞ্জের কৃষকরা বলেন, সেতু না থাকায় প্রতিদিন আটটি গ্রামের অন্তত ৫০ টন উৎপাদিত শাকসবজি বিক্রিতে সীমাহীন দূর্ভোগে পড়ে। দীর্ঘ খালে ছোট ডিঙ্গি নৌকায় করে এসব পন্য ও মানুষ পারাপারে সকাল থেকেই ভীড় লেগেই থাকে। এ কারনে সঠিক সময়ে পণ্য বাজারজাত করতে না পেরে এতোদিন লোকসান গুনতে ছিলেন কৃষকরা। তাই গ্রামবাসীদের সবার অংশগ্রহনে চাঁদা তুলে এ ভাসমান সেতু নির্মানের উদ্যোগ নেয়া হয।

স্থানীয়রা বলেন, সেতু না থাকায় স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীসহ হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন দূর্ভোগ পোহাচ্ছিলো। প্রায় খেয়া নৌকা উল্টে দূর্ঘটনা ঘটছে। তাই যে যা পেরেছে চাঁদা তুলে এ সেতু নির্মানে সহায়তা করেছেন।

সেতু নির্মানের উদ্যোক্তারা বলেন, প্রায় দেড়শ প্লাষ্টিকের ড্রাম কাঠের কাঠামোতে ভাসিয়ে এ সেতু নির্মান করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সেতুর দুই তৃতীয়াংশ নির্মান কাজ সম্পন্ন হলেও টাকার অভাবে নির্মান কাজ থেমে গেছে। নীলগঞ্জ কৃষক সমিতির সদস্যরা এ সেতু নির্মান শুরু হয়।

স্থানীয়রা বলেন, স্কুল-মাদরাসার ছোট ছোট শিশু থেকে শুরু করে গ্রামের প্রবীন ব্যক্তিরা এ সেতু নির্মানে সহায়তা করছেন। কেউ দিয়েছেন টাকা, কেউবা শ্রম। কিন্তু টাকার অভাবে পুরো সেতু নির্মান এখন অনিশ্চিত। এ খালের উপর জরুরী ভিত্তিতে একটি গার্ডার সেতু নির্মানের দাবি গ্রামবাসীদের।

এ ব্যাপারে কলাপাড়া এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মো. মহর আলী বলেন, কলাপাড়ার ৩১টি ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর তালিকা করা হয়েছে এবং ভেঙ্গে পড়া সেতুগুলো নির্মানে প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেও পর্যায়ক্রমে সব সেতু নির্মান করা হবে।

পাখিমারা খালের সেতু পার হয়ে পাশ্ববর্তী মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের তেগাছিয়া গ্রামের মানুষ ছাড়া কুমির মারা, পূর্ব কুমির মারা, পাখিমারা, মজিদর্পু, এলেমপুর, বাইনতলা, ফরিদগঞ্জ ও সুলতানগঞ্জ গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ চলাচল করতো। নীলগঞ্জ ইউনিয়ন কৃষিতে সমৃদ্ধ হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাকে করে এ গ্রামগুলো থেকে সবজি কিনে বিক্রি করে। কিন্তু সেতু ভেঙ্গে পড়ায় এখন সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে সবজি চাষী ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় গর্ভবর্তী ও শিশুর জরুরী স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে চরম দূর্ভোগ পোহাচ্ছে এলাকাবাসী।

আপনার মতামত জানান

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন